Ticker

20/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

কেঁচো খুঁড়তে সাপ! ।। সুবোধ দাশগুপ্ত

 

আজাদী দিবস উপলক্ষে শহরের একটা বড় হোটেলে এক ভোজ সভার আয়োজন হয়েছিল। কেমন করে ঠিক জানা যায় নি, নন্তুমামার সেখানে নেমন্তন্ন হয়েছিল। সুতরাং ভোম্বলকেও সঙ্গে যেতে হ'ল।

ভোজের আয়োজন হয়েছিল প্রচুর। আর ভোম্বলের ছোট বেলা থেকেই একটা বদ অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে, ভাল ভাল খাবার দেখলেই আনন্দে ওর মন নেচে ওঠে। তাই মনের আনন্দে ভোম্বল খেয়ে চললো।

যে ঘরটায় ভোজের আয়োজন হয়েছিল সে ঘরখানা যেমন লম্বা তেমনি চওড়া। ঘরে লম্বা লম্বা ভোজের টেবিল তিন চারখানা পাতা হয়েছে, সেই টেবিলগুলোর দু'পাশে সারি দিয়ে সকলে খেতে বসেছেন। খুব কম হলেও একশো'র কম হবে না। ফুল, পাতা আর রঙ-বেরঙের আলো দিয়ে ঘরখানাকে সাজানোও হয়েছে চমৎকার করে। ঘরের  শোভা বাড়িয়েছেন মহিলারা, সংখ্যায় তাঁরাও নেহাৎ কম হবেন না। কয়েকজন আবার আসল মেম সাহেব। এ পরিবেশে মন আপনা থেকেই খুশি হয়। এবং তার ওপরে আবার ভুরি ভোজনের ব্যবস্থা।

একটা টেবিলের এককোণে নন্তুমামার পাশে ভোম্বল খেতে বসেছিল। ছুরি, কাঁটা, চামচ নিয়ে খুব সুবিধা করতে পারছিল না প্রথম প্রথম কিন্তু তাতে দমবার মত ছেলে ভোম্বল নয়। কাঁটার বদলে চামচ এবং চামচের বদলে ছুরি চালিয়ে সে কোন রকমে কাজ সারছিল আর এত লোকের মাঝে গোগ্রাসে গেলাটা উচিত হবে কি-না এই কথাটাই বারে বারে ভাবছিল- এমন সময় এক বিপর্যয় ঘটল ।

এক টুকরো মাংস। ভোম্বল বেশ কায়দা করে কাঁটা দিয়ে সেটাকে আটকে ধরেছে-তারপর তার মাঝামাঝি ছুরি বগিয়ে যেই একটু চাপ দিয়েছে অমনি খট্ করে একটু শব্দ হল। তারপরই ভোম্বল সবিস্ময়ে দেখলে, মাংসের টুকরোটা আর তার প্লেটের ওপরে নেই। সেটা উধাও হয়েছে।

স্প্রিংএর মত লাফ দিয়ে মাংসখণ্ডটি পাঁচ সাতজনকে ডিঙিয়ে এক মেম সাহেবের স্কন্ধে স্থান লাভ করল এবং পরক্ষণেই পিছলে সুরুৎ করে তার ব্লাউজের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সন্ত্রস্ত হয়ে মেম সাহেব চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। এক বিরাট বারকোষে অনেকগুলি প্লেটে রসগোল্লা সাজিয়ে এক ছোকরা সেই সময় প্যান্টি থেকে আসছিল। হঠাৎ বাধা পেয়ে সে আর টাল সামলাতে পারল না। বারকোষখানা কাত হ'ল, প্লেটগুলো এদিক সেদিকে ছিটকে পড়ল, সে ছোকরাও কাত হয়ে পড়ল। আশেপাশের লোকজন হৈ হৈ করে উঠে পড়ল। ভোম্বল সেদিকে আর তাকাল না। চোখ বুজে একটা ফাউল কাটলেটের অবশিষ্টাংশ চিবোতে লাগল।

ঘরের আবহাওয়া দেখতে দেখতে বেশ চঞ্চল হয়ে উঠল। উর্দিপরা খানসামা বাবুর্চির ভীড় লেগে গেল, সামাল দিতে সকলেই ব্যস্ত হয়ে উঠল। আর সকলে এক সঙ্গে অনর্গল উপদেশ দিয়ে যেতে লাগলেন এবং সবাই সবাইকে বোঝাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন যে এমন কিছু অঘটন ঘটেনি।

ঘরের গোলযোগ শাস্ত হতে না হতেই বাইরে একটা গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেল। হোটেলের তেতলার একটা ঘরে এক বেগম সাহেবা থাকেন। তিনি হঠাৎ চেঁচাতে সুরু করলেন, 'আমার হার গেল কোথায়? '‘হীরের নেকলেশ’ খুঁজে খুঁজে তিনি হয়রান। ঘরের টেলিফোনে হোটেলের ম্যানেজারকে জানালেন তাঁর হার খোয়া যাবার কথা। বল্লেন পুলিশে এক্ষণি খবর দিতে। ম্যানেজার সাহেব পুলিশে খবর তো দিলেনই অধিকন্তু ছুটলেন তেতলার দিকে।

দেখতে দেখতে পুলিশ এসে গেল। তারা গট মট করে সিঁড়ি দিয়ে তেতলায় উঠে গেল।

বাইরের এই ব্যস্ততার আওয়াজ ঘরের ভেতরেও এসে পৌঁছল। আর না পৌঁছলেই বা কী, নন্তুমামার কান এত সজাগ যে তিনি টের পেয়ে গেলেন বাইরে একটা কিছু ঘটেছে। তাই তিনি হঠাৎ উঠে বল্লেন—চল ভোম্বল, দেখে আসি।

ভোম্বলও তাই চায়। এই ঘর থেকে পালিয়ে যেতে পারলে যেন সে বাঁচে। তবু করুণ দৃষ্টিতে রসগোল্লাগুলোর দিকে চেয়ে বল্লে, — তাই চলো মামা।

নিঃশব্দে দু'জনে বেরিয়ে পড়ল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে তেতলায় উঠে নওমামা একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি আশা করেছিলেন তেতলায় বেশ একটা উত্তেজনার ঝড় বয়ে যাবে, সকলে হস্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটি করবে, পুলিশের বড় সাহেবের চড়া গলা শোনা যাবে—কিন্তু তেতলায় এসে দেখেন, সে সব কিছুই না। উল্টে বেগম সাহেবার ঘর থেকে হাসির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে—আওয়াজ বলা ভুল হবে- হল্লা বলাই ঠিক। কারণ, সকলেই এক সঙ্গে হাসছেন। বেগম সাহেবা মিহি গলায় হাসছেন, পুলিশের বড় সাহেব চড়া গলায় হাসছেন, হোটেলের ম্যানেজার মোটা গলায় হাসছেন, আর সকলে মুখে রুমাল গুঁজে চাপা গলায় হাসছেন।

নপ্তমামাও হাসিমুখে ঘরে ঢুকে বল্লেন- ব্যাপারটা তো ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।

এখানে বলে রাখা ভাল, নপ্তমামা আসলে কিন্তু গোয়েন্দা নন – সখের ডিটেকটিভও নন। ওসব সখ ভোম্বলের আছে, নক্তমামার নেই। তবে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির জন্য তিনি সকলের কাছেই সুপরিচিত। তাই নস্তমামাকে দেখে পুলিশের বড় সাহেব হাসতে হাসতেই বলে উঠলেন,—এই যে মিষ্টার নত্ত, দেখুন তো কি কাণ্ড — বলতে বলতে আবার হেসে ফেল্লেন।

নপ্তমামীও হেসে হেসে বল্লেন—আমি নীচে থেকে শুনলুম বেগম সাহেবার হীরের নেকলেশ চুরি হয়ে গেছে আর ওপরে এসে দেখছি ব্যাপারটা সে রকম সাংঘাতিক কিছু নয়।

বেগম সাহেবা সলজ্জ হাসি হেসে বল্লেন, দেখুন, দোষটা আমারই। আমি ড্রেসিং কেসে হারটা না দেখে ভয়ানক নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। দেরাজ বাক্স সব কিছুই ওলোট পালোট করেও যখন হারটা পেলাম না তখন বাধ্য হয়েই পুলিশে খবর দিতে হল।

পুলিশের বড় সাহেব বাকীটুকু শেষ করলেন—আর বেগমসাহেবা যখন খবর দিয়েছেন তখন পুলিশের বড় সাহেবকেই খোদ আসতে হল সদল বলে।

নপ্তমামা বল্লেন—সে তো বুঝলাম; কিন্তু দামী হার খোয়া গেলে লোকে আনন্দ করবে, না, দুঃখ করবে সেইটে ঠিক মগজে ঢুকছে না।

মুখখানাকে গোলাকার করে বেগম সাহেবা বলে উঠলেন—ও! তার পরেই হেসে ফেল্লেন।

পুলিশের বড় সাহেবই অগত্যা বুঝিয়ে বল্লেন- আসলে হল কি জানেন, হারটি খোয়া গেছে মনে করে বেগম সাহেবা তো চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন আর গভীর দুঃখে মেয়েদের যা হয়, বিছানায় কাত হয়ে পড়লেন। কিন্তু বালিশে মাথা দিয়েই বুঝলেন বালিশের নীচে কি যেন খচ্ খচ্ করছে। কিন্তু তিনি এত অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে যে দিকে তাঁর খেয়াল ছিল না। যখন খেয়াল হল তখন বালিশটা তুলে দেখেন তারই তলায় তাঁরই হীরের নেকলেশটি বিরাজমান। আর ওই সময় আমরাও এসে পড়লেম এবং নেকলেশ চোরকে চোরাই মাল সমেত ধরে ফেললেম।

সব শুনে নপ্তমামা বল্লেন—গল্পটা শুনতে ভালই এবং সত্যি হলে আরো ভাল হত। নওমামার কথা শুনে পুলিশ সাহেবের মুখের রঙ বদলে গেল। তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন— তার মানে?

বেগম সাহেবার মুখও টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। তিনি বল্লেন — কী বলতে চান আপনি?

নন্তুমামা একটা ঢোঁক গিলে বল্লেন— কোন অসংলগ্ন কথা যদি বলে থাকি আমাকে ক্ষমা করবেন। তবে আমার মনে হয়, যে হারটি বেগম সাহেবা গলায় দিয়ে রেখেছেন ও হারটি বেগম সাহেবার নয়।

বেগম সাহেবা আশ্চর্য হয়ে বললেন –আমার নয়? আপনি কেমন করে জানলেন যে এ হারটি আমার নয়?

পুলিশের বড় সাহেব বড় বড় চোখ করে নক্তনামার দিকে চাইলেন।

নন্তুমামা পুলিশ সাহেবের দিকে তাকালেন না, বেগম সাহেবার দিকেও না, একটা খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বল্লেন – আমি শুনেছিলাম বেগম সাহেবার হীরের নেকলেশটি খুব দামী, তাই বেগম সাহেবার গলায় যদি নকল হীরের নেকলেশ দেখি তাহলে বলতে হয় এ নেকলেশ সে নেকলেশ নয়।

—কী বল্লেন? নকল হীরে? — পুলিশ সাহেব চড়া গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

—কেমন করে জানলেন যে এটা নকল হীরের নেকলেশ? – বেগম সাহেবাও বেশ বিচলিত হয়ে উঠেছেন বলে মনে হ'ল।

কোথায় গেল হাসি, কোথায় গেল হল্লা। ঘরশুদ্ধ লোক নীরব বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

নন্তুমামা এক নজরে সকলকে দেখে বললেন – আপনাদের ভেতরে কেউ জহুরী আছেন?

পুলিশের ছোট সাহেবও কিছুক্ষণ আগে এসেছিলেন। তিনি এতক্ষণ নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন, বললেন, হীরে জহরৎ নিয়ে নাড়াচাড়া কিছু করেছি। হীরে দেখে আসল নকল বোধ হয় বলে দিতে পারব।

হোটেলের ম্যানেজার বললেন, – হীরে জহরৎ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি আমাকে প্রায়ই করতে হয়, সুতরাং আমি হয়তো দু'এক কথা বলতে পারব।

বেগম সাহেবা ততক্ষণে গলা থেকে হারটা খুলে ফেলেছেন। পুলিশের ছোট সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বল্লেন—দেখুন তো ভাল করে, আমাকে উনি বড় ভাবনায় ফেলে দিয়েছেন।

পুলিশের ছোট সাহেব হারটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা রকম ভাবে দেখলেন, তারপর গম্ভীর মুখে হোটেলের ম্যানেজারকে দেখতে দিলেন। হোটেলের ম্যানেজার মুখ কালো করে বললেন, – তাই তো!

— তাই তো মানে কি? – বেগম সাহেবা ব্যাকুল আগ্রহে জিজ্ঞাসা করলেন। – কি রকম যেন মনে হচ্ছে—ম্যানেজার সাহেব কোন মতে বলে ফেল্লেন।

বেগম সাহেবা অধীর হয়ে বললেন, পরিষ্কার করে বলেই ফেলুন, আমাকে আর সন্দেহের ভেতরে রাখবেন না।

গলাটা কেশে পরিষ্কার করে পুলিশের ছোট সাহেব বললেন, – সত্যি কথা বলতে কি, নকল জিনিস যে এত নিখুঁত হতে পারে তা আমি এর আগে দেখিনি। তবে এটা হলপ করেই বলা যেতে পারে যে এই নেকলেশের হীরেগুলো খাঁটি নয়, তবে নেকলেশটা এমন নিখুঁত ভাবে তৈরি করা হয়েছে যে সাধারণ চোখে ধরা পড়বার কথা নয়। তবে আমাদের মিষ্টার নত্তর চোখ দু'টো যে অসাধারণ তা স্বীকার করতেই হবে।

দেখতে দেখতে বেগম সাহেবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন।

পুলিশের বড় সাহেব হোটেলের ম্যানেজারের দিকে চেয়ে বললেন—একজন ডাক্তার। বেগম সাহেবা ইশারায় জানিয়ে দিলেন, তার দরকার হবে না।

দরকার না হলেও হোটেলের ডাক্তার স্মেলিং-সল্টের শিশি হাতে করে হাজির হলেন এবং ঘরের ভেতরে ভিড় দেখে তাড়া দিলেন, – আপনারা সংএর মত এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।

ডাক্তারের তাড়া খেয়ে এক এক করে সকলে বাইরে যেতে লাগল। নপ্তমামা পুলিশের বড় সাহেবকে বললেন— আপনিও ও-রকম ভাবে চলে যাবেন না, তদন্তটা এখনই শেষ করা দরকার।

ডাক্তার বাধা দিয়ে বললেন— তদন্ত কাল করলেও কোন ক্ষতি হবে না, বেগম সাহেবাকে এখন একটু সুস্থ হতে দিন।

নন্তমামা আপত্তি জানিয়ে বললেন, – ডাক্তার সাহেবের এইখানে একটু হিসেবের ভুল হচ্ছে। চোর পালালে বুদ্ধিটা যদিও একটু বাড়ে তবু এখানে আমাদের চোর পালাবার আগেই তাকে ধরবার ব্যবস্থা করা দরকার। তাছাড়া বেগম সাহেবার যে অসুখ করেছে সেটা ঠিক ডাক্তারী অসুখ নয়। বেগম সাহেবাও ততক্ষণে উঠে বসেছেন। বললেন- আপনি ঠিক বলেছেন, চোরকে সকলের আগে ধরা দরকার।

বেগম সাহেবার কথা শুনে ডাক্তার সাহেব ঠাণ্ডা হলেন। পুলিশের বড় সাহেব নন্তুমামার দিকে চেয়ে চোখ নাচালেন। নন্তুমামা তার অর্থ খুব পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝলেন যে, এ ব্যাপারে কোন হদিস পাওয়া গেল কি-না সেই কথাই জিজ্ঞাসা করছেন। কি ভেবে নন্তুমামা জিজ্ঞাসা করলেন— আচ্ছা, আপনি কি জানেন হীরে জহরতের চোরা কারবার করে এ-রকম একটা দল পৃথিবীর বড় বড় শহরে জাল পেতে বসে রয়েছে?

পুলিশের বড় সাহেব মাথা নেড়ে বললেন – এ রকম একটা দলের কথা শুনেছি, কিন্তু এ রকম দলের কোন লোকের সঙ্গে তো আজ পর্যন্ত পরিচয় হয় নি।

নন্তুমামা গম্ভীর হয়ে বললেন, এবার বোধ হয় হবে।


হোটেলের ম্যানেজার বড় বড় চোখ করে বললেন -- বলেন কি? ওরা তো শুনেছি বোমা পিস্তল পকেটে নিয়ে ঘোরা-ফেরা করে। পুলিশের ছোট সাহেব বললেন—ঠিকই শুনেছেন।

বেগম সাহেবা জিজ্ঞাসা করলেন— আপনার কি মনে হয় এটা সে রকম কোন একটা দলের কাজ?

–আমার তো তাই মনে হয়। নন্তুমামা বললেন।

--আরে সর্বনাশ! ডাক্তার সাহেব আঁৎকে উঠলেন- ওদের পাল্লায় পড়লে তো আমাদের বেঘোরে মারা যেতে হবে।

পুলিশের বড় সাহেব অনেকক্ষণ পরে কথা বললেন— আমারও সেই রকম সন্দেহ হচ্ছিল। তবে আমার ধারণা ছিল, সে রকম কিছু এখানে অন্ততঃ পাব না।

নন্তুমামা বললেন – আমিও যে সে রকম কিছু সূত্র পেয়েছি তা নয়, শুধু অনুমান মাত্র। তবে এটা ঠিক, বাইরে থেকে চোর এসে পানির পাইপ বেয়ে উপরে উঠে, জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে নেকলেশটা চুরি করেনি। যে নেকলেশটা চুরি করেছে সে হোটেলের ভেতরেই ছিল। আর বেগম সাহেবার খুব কাছাকাছিই ছিল, এমন ভাবে ছিল যে বেগম সাহেবা কোনদিন তাকে সন্দেহ করতে পারেননি।

ডাক্তার সাহেব গরম হয়ে বললেন- —কি রকম?

হোটেলের ম্যানেজারও গরম হয়ে বললেন— কী বলতে চান একটু স্পষ্ট করে বলুন তো?

নন্তুমামা বললেন--এর ভেতর অস্পষ্ট কি দেখছেন? সবই তো দিনের আলোর মত পরিষ্কার। বেগম সাহেবার গলার নেকলেশটা চুরি করবার আগে ঐ রকম একটা নেকলেশ তৈরি করতে হয়েছে, ওই রকম একটা নেকলেশ তৈরি করবার আগে তার হুবহু একটা নক্সা করতে হয়েছে। এই নক্সা যে-ই করে থাকুক, তাকে রোজ একটু একটু করে আঁকতে হয়েছে। কারণ, একদিনে এ রকম একটা নক্সা আঁকা যায় না। আর যে একটু একটু করে এই নক্সা তৈরি করেছে—তাকে বেগম সাহেবার কাছে কাছে থাকতে হয়েছে। এমন ভাবে থাকতে হয়েছে যেন বেগম সাহেবার মনে কোন রকম সন্দেহ না হয়। আচ্ছা, এর ভেতর জটিল বা দুর্বোধ্য কিছু পাচ্ছেন?

ডাক্তার সাহেব বলে উঠলেন— আপনি তো বড় সাংঘাতিক লোক বলে মনে হচ্ছে। এখন তো আমাদের সকলের ওপরে সন্দেহ হতে পারে।

— তা' হতে পারে এবং সে রকম সন্দেহ করাটা পুলিশের কাজ। তবে আপনাদের ওপরে সন্দেহ করবার আগে বেগম সাহেবার নিজের লোকজনদের ওপরেই সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক।

বেগম সাহেবা বেশ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলি শুনছিলেন। তাঁকে কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই তিনি বলে উঠলেন—কিন্তু আমি তো কোন লোকজন সঙ্গে আনিনি।

নন্তুমামা মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, – তা'হলে তো কেসটা বেশ জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে এবং পুলিশের লোকদের তা'হলে আরো তৎপর হয়ে উঠতে হয়।

হোটেলের ম্যানেজার হঠাৎ রেগে উঠে বললেন – কিন্তু আমার হোটেলে এসব কাণ্ড!

নন্তুমামা বাধা দিয়ে বললেন—ও রকম ভাবে লাফাবেন না, আপনাকেও আমরা এখন সন্দেহ করতে পারি এবং ডাক্তার সাহেবকেও।

ডাক্তার সাহেবের মুখ শুকিয়ে গেল, তিনি একটা ঢোঁক গিলে বললেন— কিন্তু স্যার, আমি ছবি আঁকতে একদম পারি না। স্কুলে ড্রয়িংএ চিরদিন গোল্লা পেয়েছি তার রেকর্ড আছে।

নন্তুমামা গম্ভীর হয়ে বললেন—ও সব পুলিশের বড় সাহেবকে বোঝাবেন।

হঠাৎ বেগম সাহেবা বলে উঠলেন— আমি ভুল বলে ফেলেছি। আমি লোকজন সঙ্গে আনিনি ঠিক, তবে আমার সঙ্গে একজন আয়া আছে, মানে ছিল।

– ছিল? মানে এখন নেই?—এবার পুলিশের বড় সাহেব তৎপর হয়ে উঠলেন।

—ছিল মানে এই কিছুক্ষণ আগেও ছিল। আজ ছুটি নিয়ে বাড়ী গেছে।

—কখন গেছে?

—এই তো আধ ঘণ্টাও হয়নি, এখনও হয়তো নীচে অফিস ঘরে আছে। এখানে তো আবার সহজে রিক্সা পাওয়া যায় না।

হোটেলের ম্যানেজার বললেন— তাই তো, কথাটা আমার আগেই মনে হওয়া উচিত ছিল। বলেই তিনি টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে কানের কাছে ধরলেন। বললেন – আমাকে অফিস ঘরে দাও তো। তারপর অফিস ঘরের কেরানীকে বললেন—দেখ তো, বেগম সাহেবার আয়া কি চলে গেছে! না গেলে যেতে দিও না।

অফিস ঘর থেকে জবাব এল, — এই খানিকক্ষণ আগে তাকে রিক্সায় তুলে দিলাম।

-নন্তুমামার ইঙ্গিতে ভোম্বল হন্তদন্ত হয়ে ছুটল। এ সব কাজে ভোম্বলের উৎসাহ প্রচুর। পুলিশের বড় সাহেব হঠাৎ লাফিয়ে উঠলেন— আর দেরী করা চলে না। পুলিশের ছোট সাহেবও লাফিয়ে উঠলেন।

নন্তুমামা বাধা দিয়ে বললেন—একটু সবুর করুন।

—কেন, আবার দেরী কেন? চোর যদি পালিয়েই যায়, তা হ'লে ধরবো কাকে? নন্তুমামা বললেন- কিন্তু চোরকে ধরবার আগে সে দেখতে কেমন, তার চেহারা কেমন, তার চাল চলন কেমন, এ সব তো জানা দরকার। চোরকে দেখে যদি চিনতে না পারেন তা'হলে চোর তো আপনার চোখের ওপর দিয়ে পালিয়ে যাবে, আর আপনি নিরীহ লোকদের ধরে শুধু শুধু হয়রাণ করবেন।

ডাক্তার সাহেব মাথা নেড়ে বললেন – হুঁ, এর ভেতর যুক্তি আছে।

পুলিশের বড় সাহেবকেও এ যুক্তি মেনে নিতে হ'ল। তাই তিনি বেগম সাহেবাকে অনুরোধ করলেন তার আয়ার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে। বেগম সাহেবা কিছুক্ষণ চোখ বুজে থেকে বললেন – আমার আয়া দেখতে খুব ভাল নয়, আবার তাকে খুব খারাপ বলাও চলে না; গায়ের রঙ তার খুব ফর্সা নয়, খুব ময়লাও নয়; সে খুব লম্বা নয় কিন্তু বেঁটেও ঠিক বলা চলে না; মোটা সে নয় তাই বলে সে যে খুব রোগা তাও নয়; মুখখানা তার সুন্দর নয় কিন্তু তাকে কুৎসিতও বলা চলে না।

,বেগম সাহেবার কথা শুনে নন্তুমামা উৎসাহে বলে উঠলেন, – বাঃ, আয়ার যে চমৎকার ডেসক্রিপসন দিলেন এর পর চেষ্টা করলে আমরা অন্ততঃ এক ডজন আয়া গ্রেপ্তার করতে পারব। কি বলেন বড় সাহেব?

পুলিশের বড় সাহেব নন্তুমামার হাত ধরে বললেন, – আর এখানে অনর্থক দেরী করবেন না। এখন চলুন, বেগম সাহেবার আয়াকে ধরবার একটা চেষ্টা অন্ততঃ করি।

—তাই চলুন।

সকলে দল বেঁধে নীচে নেমে এলেন।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পুলিশের বড় সাহেব হোটেলের ম্যানেজারকে বললেন – আপনি তো আয়াকে দেখলেই চিনতে পারবেন?

ম্যানেজার সাহেব বললেন—তা পারব বলে মনে হয়।

–তা'হলে আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।

—বেশ তো, চলুন।

তিনখানা জীপ সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে গেল। ছোট সাহেব একখানায় চড়লেন, ম্যানেজার সাহেব চড়লেন আর একখানায়। আর একটা জীপে বড় সাহেব চড়ে বসে নন্তুমামাকে ডাকলেন— আপনি আসুন আমার সঙ্গে।

নন্তুমামা পা-দানিতে পা দিয়ে আবার নেমে পড়লেন। বড় সাহেবকে বললেন— নেমে আসুন, আমাদের আর যেতে হবে না।

ভোম্বল ও অফিসের কেরানী ততক্ষণে আয়াকে মাঝপথ থেকে ধরে এনেছে।

পুলিশের বড় সাহেব আরামের একটা নিঃশ্বাস ফেলে জীপ থেকে নামলেন।

আয়াকে নিয়ে আবার তেতলায় সকলে এলেন বেগম সাহেবার ঘরে। বড় সাহেবের হুকুমে ছোট সাহেব আয়ার সুটকেস খুলে তল্লাসী সুরু করলেন। কিন্তু সুটকেসে হীরের নেকলেশ পাওয়া গেল না।

—বেডিং?

আয়ার কোনো বেডিং ছিল না।

অনেক সুটকেসের তলায় আর একখানা ডালা থাকে। সে রকম কিছু আছে কি-না দেখবার জন্য এবার বড় সাহেব নিজেই লেগে গেলেন। কিন্তু কিছু আবিষ্কার করতে না পেরে পকেট থেকে ছুরি বের করে সুটকেসের তলাটা কেটে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বেগম সাহেবার হীরের নেকলেশ এবং আরো অনেক কিছু।

বেগম সাহেবা নেকলেশ পেয়ে খুশি হলেন। আয়াকে গ্রেপ্তার করা হ'ল। ছোট সাহেব কাগজ পেন্সিল নিয়ে ফর্দ লিখতে লিখতে বললেন—এযে দেখছি কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরবার উপক্রম হয়েছে। এই যে অনেক লোকের নাম আর ঠিকানা পাওয়া গেছে। এরা যদি দলের লোক হয় তা'হলে শুধু আমাদের নয়, লাহোর, করাচী, কোয়েটার পুলিশদেরও বেশ কয়েকমাস ব্যস্ত থাকতে হবে। আসলে হ'লও তাই। কয়েক মাসের ভেতরেই একটা বিরাট দল ধরা পড়ল। খবরের কাগজে সে সব কাহিনী পড়ে ভোম্বল বললে- এতটা হবে আমি কিন্তু ভাবতে পারি নি মামা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ