Ticker

20/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

নজর ।। গজেন্দ্রকুমার মিত্র

খুব একটা বেশি দিনের কথা নয়। গত মহাযুদ্ধের আমল সেটা। দেশ ভাগ হওয়ার ঠিক আগেই এ কাহিনীর শেষ। যে শিশুর কথা বলছি সে আজ পূর্ণ যুবক । পড়াশুনো শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছে। ঘটনাটারও ষোল আনাই প্রায় সত্য—শুধু নাম ধামগুলো পাল্‌টানো হয়েছে, পাল্‌টানো উচিত বলে ।

কার্য-কারণটা প্রথমে কেউ অত ধরতে পারে নি। সে তান্ত্রিকটি এসে না বললে আজও বোধহয় কেউ পারত না।

পূর্ববঙ্গের বাড়ি সম্বন্ধে যাঁদের ধারণা আছে তাঁরাই জানেন, পাঁচিলঘেরা ঘনসম্বন্ধ বাড়ি ওদিকে বড় একটা হ'ত না। কোঠাবাড়ির কথা আলাদা, যাঁদের মাটির ঘর—অনেক সম্পন্ন ব্যক্তিও মাটির ঘরে থাকতেন, কেউ কেউ বা বন্যার জন্যে থাকতে বাধ্য হতেন—ছিটে বাঁশের দেওয়ালে মাটিধরানো, কোথাও বা এমনিই বাঁশের ফ্রেমে সাধারণ মাটির দেওয়াল, কোথাও বা ছিটেবেড়া শুধু, মাটি নেই ; অনেক জায়গা নিয়ে তাঁদের ভিটে গড়ে উঠত, খেয়াল-খুশি মতো ছড়ানো । দাওয়া-উঁচু, বড় বড় ঘর—একটা বা একজোড়া এক জায়গায়। রান্নাঘরও তাই। ছাড়া ছাড়া, গায়ে গায়ে লাগানো নয় কোনটা কোনটার সঙ্গে— পাঁচিলের বালাই নেই—শুধু বসবাসের ঘরগুলোর সংলগ্ন জমিটা নিকোনো সাফ করা থাকত, ঘাস বা আগাছা জন্মাতে দেওয়া হ'ত না, সেইটেকেই উঠোন বলত। শহরে বা বড় শহরের উপকণ্ঠে যারা থাকেন—উঠোন বলতে তাঁরা যা বোঝেন-এ তার ধারে কাছেও যায় না ৷

আসলে এটাকে উঠোনও বলা যায়, চলন বা চলাচলের রাস্তাও বলা যায়। রাস্তা হিসেবে একটু বেশী চওড়া, এই যা। কারণ এরই একটা অংশ নির্বাধায় পুকুর পর্যন্ত চলে গেছে—গৃহবিশেষে একাধিক পুকুর–কোনটা বা গেছে পিছনের সুপুরি-নারকেলের বাগান পর্যন্ত। সেই একেবারে শেষে পাঁচ-ছ' বিঘা বা আট-দশ বিঘা, যার যেমন— জমি বাগান মিলিয়ে যেটাকে বাস্তু ধরা হয়—তার চারদিকে কারও হয়ত বা বাঁশের বেড়া, কারও বা কাঁটাগাছের——কারও বা তাও নেই, মাটি কেটে একটু নালা মতো করা আছে, সীমানা হিসেবে।

যে দিনের কথা বলছি—মুকুল বৌদি সেই রকম একটা চলাচলের রাস্তায়- উঠোনও বলতে পারেন তাকে—বসে ছেলেকে দুধ খাওয়াচ্ছিল। তখন ঠিক সন্ধ্যের মুখটা, চারদিকের বড় বড় গাছের ছায়ায় বেধে আবছা হয়ে এসেছে আলো—অথচ ঠিক আলো জ্বালারও সময় হয় নি — ঝুঁঝকি বেলা যাকে বলে এমনি সময় সেটা। কতকটা সেই আবছায়ার জন্যেই ফাঁকায় এসে বসেছিল বৌদি, কিছুটা আলো পাবে বলে ৷ সন্ধ্যা দেখানে৷ হ'লেও— পাড়াগাঁয়ে সেই প্রদীপের আলো ভরসা। দুটো হ্যারিকেন আছে। একটা নিয়ে ছেলেরা পড়াশুনো করে, আর একটা জ্বলে বাইরের চণ্ডীমণ্ডপে, মুকুল বৌদির ভাণ্ডর বসে হিসেবপত্র দেখেন—পাড়ার লোকজন এলে গল্পও করেন।

তাছাড়া সন্ধ্যা দেওয়া হলে আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। সেই সন্ধ্যে-কালটা না কাটলে নাকি খাওয়াতে নেই। অথচ দেরিও হয়ে গেছে ঢের, কিষেণ এসেছে অনেক দেরিতে, গাই দুইতে দুইতে সূর্য পাটে বসে গেছেন—ছেলেটা ক্ষিদেয় চিল-চেঁচাচ্ছে।

তৎসত্ত্বেও শাশুড়ী তিরস্কার করেছিলেন মুকুল বৌদিকে, “ও কি গা বৌমা, এই রাকুশী বেলায় তুমি পথে বসে ছেলেটাকে দুধ খাওয়াচ্ছ! খোলা জায়গা, যাতায়াতের পথ—পথ নয়, চার রাস্তার মোড় বলাই উচিত, চারটে পথ চারদিকে চলে গেছে—এই কি একটা বসবার জায়গা হ'ল ? এমন সময় কোন খোলা জায়গাতেই খাওয়াতে নেই, অন্যি দেবতাদের নজর লাগে।' অত গা করে নি মুকুল বৌদি, সত্যিই কোন বিপদ হ'তে পারে, তা ভাবে নি। ভাবার কথাও নয়। এসব ভয় থাকে মানুষের অল্প বয়সে, তবু তখনো কেউ ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না। এসবে বিশ্বাস আসে বেশী বয়সে, যৌবনে ভয়ও থাকে না বিশ্বাসও থাকে না। অস্তিত্ব একটা পরিহাসের বিষয়মাত্র।

সে বয়সে অপদেবতার এই ঘটনার কয়েকদিন পরে, ছেলের সেদিন এক বছর বয়স পূর্ণ হতে ঠিক একটি দিন বাকী—মুকুল বৌদি ছেলেকে কোলে ক'রে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক দুপুর বেলা— চড়া রোদ, তবে বৌদি দাঁড়িয়েছিল একটা বড় কাঁঠাল গাছের ছায়ায়-অতটা কড়া রোদ বোঝা যাচ্ছিল না সেখানে। অবশ্য ছায়া না থাকলেই বা কি—রোদ থাকলেও দাঁড়াতে হত । মুকুল বৌদি দাড়িয়ে ছিল, মানিক জেলের খোঁজে, যে বুড়োটা মাছ দিয়ে যায় । আজ তিনদিন তার পাত্তা নেই, ফলে কারও পেটেই মাছ যায় নি কদিন । অসুবিধাটা মুকুলেরই বেশী, ছেলেটা সবে ভাত খেতে শিখেছে—কিন্তু মাছ না হ'লে একদানা ভাতও খেতে চায় না। সেই গরজেই একেবারে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়িয়েছে, মানিককে দেখতে পেলে এক কুনকে চাল আর দু'কুনুকে ক্ষুদ কবুল ক'রে নিজেদের পুকুরেই নামাবে একবার। আগে শুধু ক্ষুদ দিলেই হ’ত —এখন আর কেবলমাত্র দু'কুন্‌কে ক্ষুদে বড় পুকুরে জাল ফেলতে চায় না ৷

- যেদিন দরকার থাকে সেদিন সামান্য বস্তুও দুর্লভ হয়ে ওঠে। বহুক্ষণ দাঁড়িয়েও মানিকের দেখা পাওয়া গেল না সেদিন। ফিরেই আসছে —হঠাৎ একটি মেয়েছেলে কোথা থেকে এসে প্রায় পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে গেল, 'আহা, কাদের খোকা গা, বাঃ, ভারি সুন্দর খোকা তো ! তোমার বুঝি গা মা ? এইটি প্রেথম—না আর আছে ? বাঃ, বুক জুড়নো ধন ! অ খোকাবাবু, আমার সঙ্গে যাবে ? পেট পুরে রসগোল্লা খাওয়াবো ?

বলতে বলতেই হাত বাড়িয়ে খোকাকে কোলে টেনে নিল সে। ইচ্ছা ছিল না মুকুল বৌদির, যার তার কোলে ছেলে দেওয়া পছন্দ করে না সে, বিশেষ, সব মুখে মুখ দিয়ে চুমো খায়- বিশ্রী লাগে ওর—কিন্তু তখন সেই মুহূর্তে ঠিক বাধাও দিতে পারল না। স্বভাবতই ছেলেমেয়েকে সুন্দর বললে মা একটু গলে যায়, আর দিনে দুপুরে পাড়ার মধ্যে ছেলেকে একবার কোলে করবে—আপত্তিরই বা কি কারণ দেখাবে ? বরং না দেওয়াটাই অভদ্রতা দেখায়। কেন দিচ্ছি না—মুখ ফুটে বলাও তো শক্ত ।

আর মেয়েছেলেটিও নেহাৎ থুহাৎ খুব ছোটঘরের কি ভিখিরি—এমনও মনে হ'ল না। বাসি করা ফরসা কাপড় পরনে, রঙটা ময়লা হ'লেও চেহারায় বেশ একটা শ্রী আছে, ওর কলকাতার মাসিমা বলেন 'লাজ্জৎ'। মুখটাও কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে, কোথায় যেন এর আগে দেখেছে ওকে। সে-ক্ষেত্রেও যদি কিছু পরে মনে পড়ে যায় যে, মেয়েছেলেটি ওদের জানাশোনা কিম্বা দূরসম্পর্কের আত্মীয় কেউ — তখন লজ্জার সীমা থাকবে না, ছেলেকে কোলে দিতে অস্বীকার করলে !

অবশ্য যে বেশীক্ষণ রইলও না। খানিকটা আদর করে, চুমো খেয়ে আবার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে চলে গেল।

সেই দিনই সন্ধ্যার সময় খোকার গা গরম হ'ল। রাত দশটা নাগাদ সে-জ্বর উঠল একশো চার ডিগ্রিতে, গা পুড়ে যেতে লাগল । ভয় পেয়ে রাত্রেই পাড়ার ডাক্তারকে ডেকে আনলেন যোগেশদা, কিন্তু তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। সর্দি নেই, কাশি নেই, বুকে সর্দি-বসা কি জল জমা কোনটারই কোন লক্ষণ পাওয়া যায় না—টাইফয়েড বা ঐ জাতীয় কোন জ্বর হ'লে সঙ্গে সঙ্গে এত জ্বর বাড়ে না। তবে এটা কিসের জ্বর ? বিষিয়ে টিষিয়ে গিয়েছিল কোনরকম ? কোথাও কেটে-কুটে যায় নি তো ? – অসহায়- ভাবে এদেরই বারবার প্রশ্ন করেন ডাক্তারবাবু জ্বর কিন্তু বেড়েই যাচ্ছে এদিকে। ভোরের দিকে সদরে লোক পাঠানো হ'ল—হাসপাতালের বড় ডাক্তারের জন্যে। সদর খুব বেশী দূরও নয়— মাইল ছয়েক—তবু খানিকটা নৌকোর পথ, ইচ্ছে থাকলেও তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় না। ফলে সেখানে পৌঁছে ডাক্তারবাবুকে ধরে নিয়ে আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে গেল। তখন আর ডাক্তারের কোন প্রয়োজন ছিল না— তার অনেক আগেই ছেলেটি মারা গেছে।

কিন্তু কী হয়েছিল, কিসে মারা গেল, এত জ্বরই বা হঠাৎ উঠল কেন, এমন নীল হ'য়ে গেল কেন ছেলে—তা এই বড় ডাক্তারবাবুও কিছু বুঝতে পারলেন না।

এর পরেও যোগেশদার একটি ছেলেই হ'ল ।

এটি আরও সুন্দর দেখতে আরও স্বাস্থ্যবান।

এর যখন এগারো মাস বয়েস, মুকুল বৌদিকে বাপের বাড়ি যেতে হয়েছিল। বাবার খুব অসুখ, মা তার আগে থাকতেই শয্যাশায়ী, এক বৌ দিল্লীতে, আর এক বৌ বাঙ্গালোরে – বাধ্য হয়েই মুকুল বৌদিকে যেতে হয়েছিল। সে কাছে থাকে, তার শ্বশুরবাড়িতেও লোকের অভাব নেই—

অর্থাৎ কাজ করবার লোকের-শাশুড়ী-পিসশাশুড়ী, বড় জা, এক বাড়ি মেয়েছেলে, এদেরও কিছু অসুবিধা ছিল না।

যেতে হয়েছিল গিয়ে থাকতেও হয়েছিল মাসখানেক — মা যতদিন না উঠে সংসারের ভার নিতে পারেন ।

এইখানে একদিন—মুকুল বৌদির বাপের বাড়িতে দু'খানা ঘর, কোঠা— তারই একটার সামনে দালানে ছেলেকে নিয়ে বসে আছে, ছেলে বুকের দুধ আজকাল খায় না বড় একটা, সেদিনই খাচ্ছিল একটু আধটু—এক বৃদ্ধা মহিলা এলেন, 'হরেন কেমন আছে রে—তোর বাবা ?”

হরেন মুকুলের বাবার নাম ।

মুকুল চিনতে পারল না ঠিক, কিন্তু চক্ষু-লজ্জায় সেটা বলতেও পারল না। ইনি যে চেনেন আর ভাল ক'রেই চেনেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। সে-ক্ষেত্রে এঁকে চিনতে না-পারাটা ওরই অপরাধ বলে বোধ হ'ল। বিশেষ একটু পরেই আবার যখন ওর মা'র নাম ধরে তত্ত্ব করলেন, ‘তরু কোথায় গেছে ? সে ভাল আছে তে৷ ?

‘মা গোপাল মামাদের বাড়ি গেছেন—কি একটু কাজে । হাসি হাসি মুখেই খবরটা দিতে হ’ল ‘আসুন, বসবেন না ?’

‘না-না। আমি যাই । এইটি বুঝি তোর খোকা ? বাঃ - বেশ খোকা । কী খোকাবাবু –তোমার নাম কি ?'

মুকুলের কোলেই রইল ছেলে, উনি শুধু গাল টিপে চুমো খেয়ে আদর করে চলে গেলেন ।

মা ফিরে আসতে মুকুল বৌদি ওঁর কথা বলল, বাবার ঘুম ভাঙ্গতে তাঁকেও। দুজনের কেউই চিনতে পারলেন না ভদ্রমহিলাকে।

এ গ্রামের তো কেউ নয়ই—কিন্তু অন্য গ্রামেরই বা কে এত পরিচিত। ঐ বয়সী যত

মহিলার কথা মনে হ'ল- খানিকটা মেলে হয়ত, পুরো কারও সঙ্গে মেলে না ।

এর দিন-দুই পরে এ ছেলেরও তেমনি জ্বর এল ।

সেই প্রচণ্ড গা- পুড়ে যাওয়া জ্বর। এ গ্রামের যিনি একমাত্র ডাক্তার, তাকে সেদিনই কি কারণে পাওয়া গেল না। সে জায়গায় বড় কবিরাজকে ধরে নিয়ে এলেন হরেনবাবু । খুব বিখ্যাত কবিরাজ, বিস্তর নামডাক- রসসাগর উপাধি। তিনি হাসতে হাসতেই এসেছিলেন কিন্তু ছেলের নাড়ি ধরতেই তাঁর মুখ শুকিয়ে উঠল। তিনি হরেনবাবুকে বললেন, 'আমাদের শাস্ত্রে যেটুকু আছে আমি করছি কিন্তু এর নাড়ির গতিক আদৌ ভাল না। তোমাদের যাতে কোন ক্ষোভ না থাকে সেইভাবে তোমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করো। অন্য কোন ডাক্তার ডাকতে চাও--ডাকো।'

যা করার সবই করা হল। সন্ধ্যা নাগাদ একজন কেন— দু'জন ডাক্তারই এলেন। যোগেশদারাও এসে পড়লেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হ'ল না—

রাত একটা নাগাদ এ ছেলেও মারা গেল।

পরে হিসাব ক'রে দেখা হয়েছিল – সেইদিনই ওর এক বছর পূর্তির দিন। আর একটা দিন বেঁচে থাকলে জন্মদিন পেত ।

এর পরের ছেলে অর্থাৎ যোগেশদার তৃতীয় সন্তানটিও যখন এইভাবে ঠিক এক বছরের হয়ে মারা গেল, তখন সকলেই চঞ্চল হয়ে উঠলেন। এতটা একেবারে কাকতালীয় হ'তে পারে না অন্তত অনেকেরই তাই মনে হ'ল। ঠিক এক বছর বয়স হ'লেই মরছে, আর একই ধরণের জ্বর, এক রকম লক্ষণ—জ্বর হওয়ার ঠিক আগে একজন ক'রে অচেনা লোক আদর ক'রে যাচ্ছে—সবটাই স্বাভাবিক, দৈবের যোগাযোগ বলে মানতে চাইলেন না তাঁরা। তৃতীয় সন্তানটির বেলাও নাকি সেই জ্বর আসার আগের দিন যোগেশদা কোলে ক'রে বেড়াতে বেরিয়ে ছিলেন—কে একটি অল্পবয়সী ফ্রক পরা মেয়ে পথে ধরে কোলে ক'রে প্রচুর আদর করেছিল। অত অল্প বয়সের মেয়ে বলেই কোন সন্দেহ হয় নি যোগেশদার—কিন্তু এখন 'প্যার্টান' মিলে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে সে একই ব্যাপার ।

এর পর কিছু যে একটা করা দরকার সে বিষয়ে কারও সন্দেহ রইল না। সকলেই নিজের নিজের বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা মতো উপদেশ দিতে লাগলেন। নানা ধরণের পরিকল্পনা, অনেক সময় পরস্পরবিরোধীও হয়ে উঠতে লাগল । শেষ পর্যন্ত কিন্তু যোগেশদার মামা কামিনীবাবুর পরামর্শটাই এঁদের সকলের মনে লাগল। কামিনীবাবু জানালেন— ওঁদের গ্রাম থেকে তিনখানা গ্রাম পরে এক তান্ত্রিক সাধক থাকেন— পিশাচসিদ্ধ, খুব বড় সাধক নাকি— তাঁকে গিয়ে ধরলে এর প্রতিকার হতে পারে। তিনি নাকি প্রসন্ন হ'লে দিনকে রাত ক'রে দিতে পারেন—এমন বহু লোকের বহু উপকারই করেছেন তিনি, জীবনও রক্ষা করেছেন, কামিনীবাবুর এক সম্বন্ধীকে ঘোর সর্বনাশ থেকে উদ্ধার করেছেন। তবে পয়সার লোভ দেখিয়ে কিছু করানো যাবে না, সে-মানুষ নন, খেয়াল হ'লে করবেন — নয় তো একেবারে হাঁকিয়ে দেবেন। খেয়াল হ'লে নিজেই পয়সা চেয়ে নেবেন, নইলে – সেধে কেউ দিতে গেলে হয়ত লাথি মেরে বসবেন। নয়তো মুখে থুতু দিয়ে দেবেন।...একবার চেষ্টা ক'রে দেখা হোক তো অন্তত। যা মনে হচ্ছে সত্যিই যদি তা-ই হয়, যদি কোন অপদেবতারই ব্যাপার হয় এটা—ওর দ্বারাই একটা সুরাহা হবে।

পরামর্শট। সকলেরই মনে লাগল । কামিনীবাবু বলে দিলেন, পাইখানার কাপড়ে বা সম্ভব হ'লে আরও অশুচি অবস্থায় তাঁর কাছে যেতে হবে। ঘোর নোংরার মধ্যে বাস করেন তিনি। কিন্তু তা দেখে ঘেন্না করা চলবে না, বা সে সম্বন্ধে কোন মন্তব্য করাও না ।

স্থির হ'ল যোগেশদা, তাঁর দাদা ক্ষিতীশবাবু আর কামিনীবাবু—এই তিনজনে যাবেন সেখানে। ...

'দুর্গা' বলে একদিন শেষ রাত্রে নৌকো ক'রে রওনা দিলেন ওঁরা। যেখানে গিয়ে যাত্রা শেষ হ'ল—নদীর ধারেই একটা বিরাট পাকুড় গাছের দুটো মোটা শিকড়ের খাঁজে কোনমতে আটকে থাকা একটা ভাঙ্গা চালাঘর —এড আবর্জনায় পূর্ণ যে, দূর থেকেই তার দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। আর তেমনি সে লোকটিও, বড় বড় চুল, বাঘের মতো নখ, বোধহয় বছর দশ বারো চান করেন নি, পরনের কাপড়-জামাও তথৈবচ, রাস্তায় যে সব পাগল ঘুরে বেড়ায় তাদের মতোই গায়ে পুরু হয়ে ময়লা জমে আছে। সবটা জড়িয়ে এমন একটা বদগন্ধ যে কাছে যায় কার সাধ্য !

তবু যেতে হ'ল, প্ৰণামও করতে হ'ল। কে জানে কেন, তিনি অতি সহজেই প্রসন্ন হলেন । সব শুনে বললেন, 'তরা য৷ গিয়া, আমি যাইতাছি। ছেম্বাটারে না দেইখ্যা কিছু বলন যাইব না।'

এঁরা রাহা-খরচ বাবদ কিছু দিতে গেলে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন একটা।

আশ্চর্য এই, এতটা দূরের পথ, নৌকো করে যখন ফিরে এলেন ওঁরা তখন সন্ধ্যা হয় হয়, কিন্তু বাড়ি ঢোকার মুখেই যার সঙ্গে দেখা হ'ল সে সেই তান্ত্রিক সাধু, ঘোষালমশাই। বিড়ষিড় ক'রে বকতে বকতে বাতাসে শুঁকতে শুঁকতে যোগেশদাদের বাড়িতেই ঢুকছেন। হ'তে এঁদের বিস্ময় লক্ষ্য ক'রে হা-হা করে হেসে উঠলেন।

আর কি যেন

চোখোচোখি হাসিটাও যেন




ঠিক সাধারণ মানুষের হাসি নয়, সে হাসির শব্দে এঁদের সর্বাঙ্গ শিউবে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। গাছ-পালায় যে সব কাকপাখীর দল রাত্রির মতো এসে আশ্রয় নিয়েছিল তারাও ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে উঠল।...

ঘোষালমশাই সেই প্রায় অন্ধকারেই মুকুলকে ভাল ক'রে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, তার পর আশ্চর্য কোমল সুরে বললেন, 'মা, গুরুজনরা যা বলে তা শুনতে হয়। শাশুড়ী বারণ করেছিলেন—কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিলে, মনে মনে হেসেও ছিলে। কিন্তু ওঁরা বহুদর্শী লোক, যা বলেন ভেবেই বলেন । সন্ধ্যাবেলা চলাচলের পথে বসে দুধ খাইয়েছিলে কেন—বড় ছেলেটাকে ? আর জায়গা পাও নি '

সকলেই চমকে উঠল। কথাটা অনেকেই জানত না, যারা জানত তাদেরও মনে ছিল না। শুধু সেই সামান্য একটি তুচ্ছ ভুলের যে এতদূর পরিণাম হ’তে পারে—তা বোধহয় মুকুলের শাশুড়ীও ভাবেন নি। মুকুল বৌদি ভো ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠল। ভয়ে দুঃখে অনুতাপে দেখতে দেখতে তার কপালে বড় বড় ফোটায় ঘাম দেখা দিল, গলার কাছে কান্না ঠেলে উঠতে

লাগল ।

যোগেশদার মা-ই প্রথম কথা কইলেন। তাঁরও গলায় কান্না – বললেন, ‘তাহলে কি হবে বাবা ? আমার বৌমার কোন ছেলে বাঁচবে না ?”

'কে বললে বাঁচবে না ? সব ভাইতে কথার ডগ কাটিস কেন মাগী ? বাঁচবে না তো আমি আছি কি করতে ?... সব ঠিক ক'রে দেব। এই তো আবার সামনে ছেলে আসছে ওর । এ বাঁচবে, ওর আরও ছেলেমেয়ে হবে, সব বাঁচবে। তবে যা বলে যাচ্ছি ঠিক মতো তাই শুনতে হবে। যতদিন না ছেলের আঠারো মাস বয়স হচ্ছে—ততদিন ছেলেকে কোন খোলা জায়গায় বসিয়ে খাওয়াবে না, সন্ধ্যার পর ঘরের বার করবে না। আর কোন অচেনা লোকের কোলে দেবে না। এই যদি শুনে চলতে পারো তা'হলে আর ভয় নেই। এ ছেলে আঠারো মাস পেরিয়ে গেলে অন্য ছেলেমেয়েও বাঁচবে !

'কিন্তু' ক্ষিতীশবাবু খুব ভয়ে ভয়েই প্রশ্ন করলেন, মা'র লাঞ্ছনা দেখে ভয় হয়ে গেছে তাঁর, ‘যদিই কোন বিশেষ কারণে বার করতে হয় ?'

'নিতান্তই যদি বার করতে হয়' এবার আর খি চিয়ে উঠলেন না ঘোষাল- মশাই, ‘সর্ষের তেলের মশাল জ্বালিয়ে এক হাতে মশাল আর এক হাতে ছেলে




নিয়ে বেরোবে—যে-ই বেরোও। যতক্ষণ বাইরে থাকবে—যার কোলে থাকবে—তার হাতে সেই মশাল থাকবে, নেভা চলবে না।”

ঘোষালমশাই বাইরে পুকুরপাড়ে বসে পান্তাভাত আর বাসি মাছের অম্বল খেয়ে চলে গেলেন, যাবার সময় কী ভাগ্যি একটা টাকাও চেয়ে নিলেন ক্ষিতীশবাবুর কাছ থেকে । যোগেশদা তাড়াতাড়ি পাঁচটা টাকা বার ক’রে দিতে গিয়েছিলেন—তাঁকে কুংপিত কটু ভাষায় গালাগাল দিয়ে উঠলেন। যোগেশদা সামনে থেকে পালাতে পথ পান না ।

ঘোষাল মশাইয়ের প্রথম কথাটা অচিরেই ফলে গেল অবশ্য—একটি ছেলেই হ'ল আবার মুকুল বৌদির—আগের মতোই সুন্দর ফুটফুটে ছেলে— তবে ভাতে আরও চিন্তা বেড়েই গেল—ঠিক নিশ্চিন্ত হ'তে পারল না কেউ। ঘোষালমশাইয়ের আশ্বাসবাণী যে সত্য হবে তা এখনও প্রমাণিত হয় নি । ছেলে এর আগেও হয়েছে সুশ্রী স্বাস্থ্যবান তিনতিনবারই হয়েছে—এক বছর ক'রে বেঁচেওছে—কিন্তু রাখতে পারা যায় নি। এবারই কি থাকবে ? সত্যিই কি ঘোষালমশাইয়ের কোন শক্তি আছে ?...

জন্মদিন যত কাছে আসে ততই যেন কণ্টকশয্যা বোধহয় সকলের- মা-বাবা ঠাকুমার তো বটেই— জ্যেঠাজ্যেঠিদেরও কম নয় । বার বার এই বিশ্রী কাণ্ড হয়ে যাচ্ছে, কারুরই ভাল লাগছে না সেটা ।

কিন্তু ঘোষাল মশাইয়ের প্রভাবেই হোক, আর সাবধানে থাকার জন্যেই হোক,—উৎকণ্ঠ রুদ্ধ নিঃশ্বাস প্রতীক্ষার মধ্যে দিয়ে এক সময় এক বৎসর পূর্ণ হয়ে গেল খোকার। তাও যেন বিশ্বাস হ'তে চায় না, সবাই বারবার হিসেব করছেন—পাজি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন—তবুও দুর্ভাগ্য যে সত্যিই কাটল, এক বছর যে ভালোয় ভালোয় পার হয়ে গেল, একথা ভাবতে পারেন না আর। সেই কারণেই আরও দুটো-তিনটে দিন ছটফট করল সবাই—আশা ও আশঙ্কায়, নিদারুণ সংশয়ের মধ্যেই, তারপর একটু একটু ক'রে যেন নিশ্বাস পড়ল সকলের, আবার সহজ হ'তে শুরু করলেন সবাই ।

অবশ্য ফাড়া একেবারে কাটে নি এটাও ঠিক, ঘোষালমশাই আঠারো মাস বা দেড় বছর সময় বেঁধে দিয়েছেন, ঐ সময় পর্যন্ত সাবধানে থাকার



নির্দেশ আছে—তবু আসল সেই ভয়ঙ্কর এক বছরের সীমানা তো পেরিয়ে আসতে পারা গেছে। এই তো ঢের । ......

অনেকদিন পরে আবার এবাড়ির মেয়েদের মুখে হাসি ফুটল ।

এই একটা বছর খুবই সাবধানে ছিলেন এঁরা। মধ্যে একবার রাত্রে বার করতে হয়েছিল খোকাকে, — মুকুল তখন বাপের বাড়িতে, হঠাৎ এঁদের এক জ্যাঠা এসে পড়লেন--মানে যোগেশদাদের জ্যাঠা— 'ভারত ছাড়ো আন্দোলনে জেলে গিয়েছিলেন—দীর্ঘকাল পরে ছাড়া পেয়ে একবার এঁদের সনে দেখা করতে এসেছেন। সেইদিনই ভোররাত্রে রওনা হতে হবে, অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দরকার — গুরুতরভাবে পীড়িত, একদিন দেরি হওয়া মানেও মৃত্যুর দিকে একপা বেশী এগিয়ে যাওয়া —— সুতরাং তাঁকে নিয়ে যাওয়া যায় নি অত দূর, রাত পোহানো পর্যন্ত অপেক্ষাও করা যায় নি। খোকাকেই আনতে হয়েছিল।

·

দূর বেশী নয়।

একটু, খানিকটা পথ

মাত্র মাইল চারেকের ব্যবধান, তবু দেরি লাগে নৌকোয় ও খানিকটা হেঁটে আসতে হয় কিম্বা গোরুর গাড়িতে। সেই সমস্ত পথই হরেনবাবু এক হাতে নাতিকে আর এক হাতে মশাল নিয়ে এসেছেন—কারুর হাতেই দেন নি। ফলে এখানে এসে যখন পৌঁছলেন, কোন হাতই আর নাড়বার ক্ষমতা নেই। তিন দিন ধরে সেক মালিশ দিয়ে তবে সাড় ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল।

এইভাবেই হুঁশিয়ার থাকতে হবে, নিয়ম-কানুন সতর্কতা একটুও শিথিল করা যাবে না—সে সম্বন্ধে সকলেই সচেতন, কারুরই দ্বিমত নেই— পরস্পরকে বলেওছেন বার বার, তবু করে এবং কখন যে সে সতর্কতা শিথিল হয়ে এসেছে একটু, তা কেউই টের পান নি ।

এমন কি, যার সবচেয়ে সজাগ থাকার কথা, সেই মুকুলও যে কখন নিজের অগোচরেই একটু ঢিল দিয়েছে, আগের সেই সদা সতর্কতায়—তা সেও বুঝতে পারে নি। আর তার ফলেই সেদিন একটা অঘটন ঘটে গেল।

কালটা পূৰ্বাহ্ন বেলা, নটা-সাড়ে নটা হবে, বাড়িতে লোকজনও বিস্তর । আর সেই জানোই কারও খেয়াল হয় নি কথাটা। আর একেবারে বাইরেও নয়, দরজা ঘেঁসে বসে ছিল ঠিকই—তবু ঘরের মধ্যে বসেই মুকুল দুধ খাওয়াচ্ছিল



তার ছেলেকে। এক বছরের হ'লেও এখনও ঝিনুকে দুধ খায় খোকা গ্লাসে বা বাটিতে চুমুক দিতে শেখে নি ।

ব্যাপারটা কেউ লক্ষ্যও করে নি।

সকলের চোখের সামনে বলেই হয়ত বিশেষ করে লক্ষ্য করার মতো মনে হয় নি কারও।

একান্ত সহজ ও স্বাভাবিক দৃশ্য। ঘরের সামনে দাওয়ায় বসে খাওয়ালেও কেউ লক্ষ্য করত না । লক্ষ্য করার কিছু আছে বলেও ভাবত না।

সেই জন্যেই বুড়িটা কখন এসে দাঁড়িয়েছে এবং একদৃষ্টে চেয়ে আছে ছেলেটার দিকে—তাও কেউ অত লক্ষ্য করে নি।

এই সময়টা পাড়ার বহু মেয়েছেলেরা আসে। আসে তারা নানান কাজে। কেউ ধান ভেনে দিয়ে যায়, কেউ বা ঘরের কোন কাজ করতে আসে ; কেউ আসে মাছ বেচতে, কেউ মুডি ভাজতে; কেউ গোয়ালের কাজ করে। কেউ বা নিজের গরজেই আসে— টাকা ধার করতে, তেল ধার করতে, চাল ধার করতে। ভিক্ষার্থী সাহায্যার্থী হয়েও আসে অনেকে।

তাছাড়া অনেকেরই এটা যাতায়াতের পথও। এদের বড় পুকুরে স্নান করতে আসে অনেকে। পুকুরপাড় থেকে শাক ভুলতেও। এদিক থেকে ওদিকের কোন বাড়ি যাবার পক্ষেও এদের উঠোন ডিঙিয়ে যাওয়া সহজ। সময়টাও কর্মব্যস্ততার এসব দিকে সকালের জীবন শুরু হয় শহরের থেকে অনেক পরে । সে জন্যেও কতকটা —ধীরেসুস্থে কেউ কারও দিকে নজর রাখতে পারে না ।

নজরে পড়ল প্রথম যোগেশদার মারই। মুকুল যে দরজার কাছে বসে ছেলেকে দুধ খাওয়াচ্ছে তা তিনিও দেখেছেন—কিন্তু অত লক্ষ্য করেন নি, অর্থাৎ সে ঘটনার পূর্ণ তাৎপর্যটা তাঁর মাথায় যায় নি। এখনও বুড়িটার দিকেই তাঁর আগে নজর গেল — অপরিচিত মুখ। এ-গ্রামের কেউ তো নয়ই—ঠিক পাশের কোন গ্রামেরও নয়। কেমন একরকমের হাসি-হাসি মুখে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে—প্রায় পলকহীন চোখে

সেই দৃষ্টি অনুসরণ ক'রেই এবার তিনি যেন প্রথম দেখতে পেলেন মুকুলের কাণ্ডটা ।

সঙ্গে সঙ্গে প্রায় আর্তনাদ ক'রে উঠলেন তিনি, 'বৌমা !'



সে চীৎকারে সকলেই চমকে উঠল। মুকুল তো উঠবেই, ত্রস্ত হয়ে শাশুড়ীর দিকে তাকাতেই তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ ক'রে বুড়িটাকেও দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে তার গলা দিয়েও একটা ভীত আতঙ্কগ্রস্ত স্বর বেরোল— সে সভয়ে ছেলেকে বুকে চেপে ধরে আঁচল দিয়ে ঢাকতে ঢাকতে ভেতরে সরে গিয়ে সশব্দে কপাট দুটো বন্ধ ক'রে দিল ।

মহা বিরক্ত হ'ল যেন বুড়িটা । অপমানাহত ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে বলল, 'কেন্, কেন্, বিষয়ডা কি ? আমি কি নজর দিতাম নাকি ? বলি নজর দিচ্ছিলাম মনে করো নাকি ? পোলাটারে যে সরাইলা ? ছিঃ ছিঃ। এমনে ভাব নাকি আমার তো কাম সারাই হইয়া আইছিল, চলিয়াই তো যাইতাম । এত আবার গগুগোলের আছেড়া কি ?

বিড় বিড় ক'রে বকতে বকতে বুড়িটা আশ্চর্য রকমের ক্ষিপ্রবেগে চলে গেল ।

এঁরা সকলেই এত হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, সে কে, কোথায় থাকে, কোথা থেকে এসেছে এবং কী দরকারে – সে সব প্রশ্ন করার কথা কারও মনেও পড়ল না—দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবার আগে ।

সেইদিনই সন্ধ্যায় বাচ্ছাটার জ্বর হল । সেই ভূতুড়ে জ্বর।

এদের মুখ শুকিয়ে আস৷ স্বাভাবিক। মুকুল এবং মুকুলের শাশুড়ী কান্নাকাটি শুরু করবেন—তাতেও বিস্মিত হবার কিছু নেই । সকলেই ধরে নিলেন যে আর কোন প্রতিকার সম্ভব নয়, একেও হারাতে হবে এবার। এমন কি ক্ষিতীশদা যখন ডাক্তার ডাকতে উদ্যত হলেন, তখন যোগেশদাই তাঁকে বাধা দিল, 'কী লাভ দাদা, বুঝতেই তো পারছ।'

কিন্তু, সামনে সেই-সবল-দিক আচ্ছন্ন-করা অন্ধকারের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশার আলো এই যে, এবারে জ্বরের তাপটা পূর্ববারের মতো ভয়াবহ নয়—গতিটাও অত দ্রুত নয়। শেষ রাত্রেও একশো তিনের বেশী উঠল না । ছেলেও তেমন বেহুঁশ হয়ে পড়ল না ।

ক্ষিতীশদা তখনই মনস্থির ক'রে ফেললেন।

আর কারও কথা শুনবেন

না তিনি। একেবারেই সদর থেকে বড় ডাক্তার ডাকবেন। তাঁর এবার একটা ঘোড়া হয়েছে। সদরে পৌঁছতে এক ঘণ্টার বেশি লাগবে না। যদি



ডাক্তারকে ধরতে পারেন তো বেলা নটা-দশটার মধ্যেই তাঁকে নিয়ে চলে

আসতে পারবেন।

---

যোগেশদারও বোধ হয় — জ্বরটা দেখেই— একটু ক্ষীণ আশার সঞ্চার হয়েছে-তিনি আর বাধা দিলেন না।

কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে রাস্তায় এসে পড়তেই— ঘোড়াটা হঠাৎ ভয় পেয়ে সামনের পা ভুলে চীৎকার ক'রে উঠল। ক্ষিতীশদা পড়ে যেতে যেতে কোনমতে সামলে নিয়ে চেয়ে দেখলেন— সামনে একটা মানুষের মতো কি! সেই শেষ-রাত্রের ঝাপসা আলোতে আর একটু ঠাউরে দেখলেন – ঘোষাল মশাই, আপন মনেই বিড় বিড় ক'রে কি বকছেন আর ওপরদিকে মুখ তুলে কী যেন শুঁকছেন।

এবার মনে পড়ল তাঁর কথাটা সবাইকারই। ক্ষিতীশদা ঘোড়া থেকে নেমে তাঁর পায়ে পড়লেন ৷

ঘোষাল মশাই মুকুলকে ও মুকুলের শাশুড়ীকে খুব তিরস্কার করলেন। তাঁর তিরস্কার সাধারণ তিরস্কার নয়—কুৎসিত কদর্য ভাষা— এমনিই শুনে কানে আঙ্গুল দিতে হয়। ছেলেপুলে কি গুরুজনদের সামনে দিলে তো— দাড়ানোই যায় না।

তবে অভয়ও দিলেন ঘোষাল মশাই। বললেন, 'ডাক্তার ডাকতে হবে না। ও বেটাদের কৰ্ম্ম নয়। ওরা জানে মানুষ মারতে। এমনিই ভাল হয়ে যাবে। চরম অনিষ্টটা হতে পারে নি —আর দুটো মিনিট দেরি হ’লে তাও হ’ত—তখন আর কিছুতেই বাঁচানো যেত না। যাক গে, আমি আছি, ছেলের জ্বর না ছাড়লে যাচ্ছি নি, তোরা নিশ্চিন্তি থাক।'

তিন দিন থাকবেন তিনি বললেন । কোথায় থাকবেন কী খাবেন সে সম্বন্ধেও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে দিলেন। বাড়ির সীমানার বাইরে পাড়ার আঁস্তা- কুড় যেটা—জঞ্জাল-টঞ্জাল ফেলা হয়, সেদিনও একটা আধপচা মরা কুকুরকে ফেলে দিয়ে গেছে—সেইখানে থাকবেন। রসুন দিয়ে পচা মাছের তরকারী রেঁধে দিতে হবে—আর পান্তাভাত। কেবল শেষদিন রাত্রে--- অতিরিক্ত দু বোতল দিশী মদ এবং খানিকটা ঝলসানো-পোড়া মাংস চাই ।

ঠিক তিন দিনের দিনই ছেলের জ্বর ছেড়ে গেল ।

বোষাল মশাই বললেন, 'আর তর নেই – এবার যা খুশি করতে পারিস।



আর সে আসবে না, অন্তত এ-বাড়ি ঢুকবে না। তবে আঠারো মাস পূর্ণ হবার আগে এ-বাড়ির বাইরে কোথাও যাস না, আর দেরিও তো নেই— মোটে দুটো মাস । না-ই বা গেলি কোথাও!'

ঘোষাল মশাইও সেইদিন রাত্রে অন্তর্হিত হলেন । পরের দিন ভোরে উঠে আর তাঁকে দেখা গেল না । যেমন হঠাৎ এসেছিলেন তেমনি হঠাৎই

চলে গেলেন ।

এর মাসখানেক পরে একদিন সেই বুড়িটাকে আবার ওদের বাড়ির সামনে রাস্তায় দেখা গিয়েছিল। যেন কি একটা মতলবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভেতরে ঢোকারই ইচ্ছে—কিন্তু ঠিক ঢুকতে সাহস করছে না—ভাবভঙ্গী কতকটা সেইরকম ।

যোগেশদার মা-ই প্রথম দেখতে পান তাকে । চিনতেও পারেন সঙ্গে সঙ্গে। তিনিই চীৎকার ক'রে ছেলেকে ডাকেন। চীৎকারে যোগেশদা ক্ষিতীশদা দু'জনেই ছুটে আসে। সেদিন বাড়িতে অনেকে এসে পড়েছিল-- ক্ষিতীশদার ভাগ্নেরা, কামিনী মামার ছেলেরা — বিস্তর ছোকরা। তারাও হৈ-হৈ ক'রে বেরিয়ে পড়ল ।

এরা কেউই চিনত না বুড়িকে—কিন্তু ব্যাপারটা শুনেছিল। যোগেশদা সেদিন দেখেছিল— আজও চিনতে পেরেছে। মা এদের কাছে পরিচয়টা দিতে দিতে সে রাস্তায় বেরিয়ে ছুটতে লাগল বুড়িটার পিছনে। বহুদিনের নিরুদ্ধ উম্মা তার—স্ত্রী-হত্যা হয় হোক—ডাইনীটাকে নিজে হাতে পুড়িয়ে মারবে সে।

ততক্ষণে ছেলের দলও বেরিয়ে এসেছে। সবাই মিলেই ছুটতে শুরু করল। বুড়িও ব্যাপারটা বুঝে ছুটতে শুরু করেছে আগেই । তবে তা নিয়ে ওরা কেউ মাথা ঘামায় নি অত, একে মেয়েছেলে তায় বুড়ো মানুষ— কতক্ষণ পারবে ওদের সঙ্গে ছুটতে ?

কিন্তু আশ্চর্য এই—এরা সকলেই অল্পবয়সী, গ্রামের ছেলে, খেলাধুলোও করে সকলে—ছোটা প্রত্যেকেরই অভ্যাস আছে এদের, তবুও বুড়িটাকে ধরতে পারল না ওরা । ওরা যত জোর দেয় বুড়িও তত জোরে দৌড়য়।--

ছুটতে ছুটতে ক্রমশ গ্রামের সীমানায় এসে পড়ল। সামনে দিগন্ত-বিস্তৃত




মাঠ—ধানের ক্ষেত। অবশ্য তখন ধান কাটা হয়ে গেছে, তবুও দৌড়তে অসুবিধে হয় বৈকি।

সে অসুবিধে দু' পক্ষেরই হবার কথা। কিন্তু এই সময় একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। মাঠের মাঝামাঝি একটা গাছ ছিল, সম্ভবত শিমুল গাছ, বিরাট বহুদিনের গাছ। বুড়িটা সেইখানে গিয়ে হঠাৎ—সেই প্রকাশ্য দিবালোকে সকলের সামনে—চোখের নিমেষে মিলিয়ে গেল। আগের মুহূর্তেও সকলে দেখেছে বুড়িটাকে সেই গাছট৷ দু' হাতে জড়িয়ে ধরতে—পরমুহূর্তেই আর কোন চিহ্ন দেখতে পেল না তার ।

ভয় হবারই কথা। ভয় হলও। যতই দিনের আলো হোক, আর দল বেঁধে থাক—এমন অলৌকিক অবিশ্বাস্য কাণ্ড দেখলে কার না ভয় হয় ? সকলেরই গা টা ডোল দিয়ে উঠল একবার। মুখ শুকিয়ে গেল ।

কিন্তু যোগেশদাও প্রতিহিংসায় স্থির প্রতিজ্ঞ ।

সে বলল, 'এই, আমি এখানে আছি। তোরাও জন-দুই থাক! বাকী সব বাড়ী গিয়ে কিছু কাঠ খড় আর তেল নিয়ে আয়, গাছটাকে পুড়িয়ে দেব।'

সেই মতোই ব্যবস্থা হ'ল। চারিদিকে কাঠ খড় সাজিয়ে তেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল। বিপুল অগ্নিশিখা উঠল গাছটার চারদিক বেয়ে—সে আগুন আর ধোঁয়া দূর-দূরান্তরের গ্রাম থেকেও দেখা গেল । শয়ে শয়ে লোক ছুটে এল ব্যাপার কি দেখার জন্যে। ডালপালা শাখা-প্রশাখা পত্র-পল্লব সব ঝসে পুড়ে গেল কিন্তু আশ্চর্য এই, মুলকাগুটা কিছুতেই পুড়ল না—বহু চেষ্টা করেও। সন্ধ্যা পর্যন্ত চেষ্টা ক'রে যোগেশদাকেও হাল ছাড়তে হ'ল শেষ অবধি । ছালগুলো পুড়ে সাদা ছাই হয়ে গেল সেই অসহ উত্তাপে কিন্তু কাণ্ডটা যেমন ছিল তেমনি দাঁড়িয়ে রইল।-

আজও আছে নাকি । তেমনিই খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। সেদিনও এক দল এসেছে দেশ থেকে। পাকিস্তান হবারও বেশ কয়েক বছর পরে তারাও এসে গল্প করেছে— শাখা-প্রশাখাহীন নিষ্পত্র সাদা কাণ্ডটা তেমনিই আছে—আজও । না পচছে না ঘুণ ধরেছে তাতে। কে জানে আরও কতকাল থাকবে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ